আট মাসের সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই কলেজে যান তনুশ্রী

আট মাসের সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই কলেজে যান তনুশ্রী

তনুশ্রী দাশের কলেজ ব্যাগে নিজের বই–খাতার পাশাপাশি ছেলের ডায়াপার, পানি, খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও থাকে। তনুশ্রী বলেন, কলেজে যাওয়ার সময় নিজের বই–খাতার চেয়ে তাঁর আট মাস বয়সী ছেলের জিনিসপত্রই বেশি সঙ্গে নিতে হয়।

তনুশ্রী রাজধানীর বাড্ডার মহানগর কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আগামী ডিসেম্বরে তাঁর এইচএসসি পরীক্ষা। ২০১৯ সালে ১৯ বছর বয়সে বিয়ে করেন তনুশ্রী। তাঁর ছেলে আবেগের বয়স এখন আট মাস।

তনুশ্রী জানান, ছোটবেলায় তাঁর কিছু শারীরিক জটিলতা ছিল। এ কারণে পড়াশোনায় কিছুটা ‘গ্যাপ’ পড়ে। নিজের পছন্দের পর পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। করোনার কারণে গত দেড় বছর কলেজ বন্ধ ছিল।

১২ সেপ্টেম্বর থেকে কলেজ খোলে। এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই কলেজে যান তিনি। কলেজের শিক্ষক, কর্মচারী, বন্ধুরা তাঁকে নানাভাবে সহায়তা করেন।

তনুশ্রী বলেন, ‘বাসায় সব কাজে সাহায্য করেন স্বামী। কলেজেও সবাই সহযোগিতা করেন। এই সহযোগিতাটা না পেলে এত ছোট বাচ্চা নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারতাম না। অনেক সময় ছেলেকে কোলে নিয়েই ক্লাসে যাই। আবার এমনও হয়, যে বন্ধুদের ওই সময় ক্লাস থাকে না, তাঁরা আমার ছেলেকে রাখে।’

তনুশ্রী ফেসবুকের একটি গ্রুপে তাঁর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে কলেজে যাওয়ার ছবি পোস্ট করেছিলেন। এই ছবি দেখে অনেকেই তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। তাঁর প্রশংসা করেন। তনুশ্রীর ক্লাস সকাল নয়টায় শুরু হয়।

শেষ হয় বেলা সাড়ে ১১টায়। তাঁর স্বামী অমিত বাড়ৈই মোবাইলের আর্থিক সেবাদানকারী একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। স্বামী-সন্তান নিয়েই তনুশ্রীর সংসার। সকালে তিনজনই একসঙ্গে বের হন।

অমিত তাঁর স্ত্রী-ছেলেকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে নিজের অফিসে যান। অফিস থেকে ফিরে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে ছেলের দেখভাল করেন। সংসারের কাজকর্ম করেন। এভাবেই চলছে তাঁদের দিন।

গত সোমবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে কথা হয় তনুশ্রীর সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, স্বামী ছেলেকে কোলে নিয়ে নিচে হাঁটাহাঁটি করছেন। আর এই ফাঁকে তিনি সংসারের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। তনুশ্রী বলেন, ‘আমার শারীরিক কিছু জটিলতার জন্য বিয়ের পর চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত সন্তান নিতে হয়। যেদিন কলেজে যাই, সেদিন ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠি। ঘরের কাজকর্ম সারি। ছেলেকে নিয়ে কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। কলেজে গিয়ে নাশতা করি। কলেজ শেষে বাসায় ফিরে সবার আগে ছেলেকে গোসল করাই, খাওয়াই, ঘুম পাড়াই। তারপর রান্নাসহ ঘরের কাজ করি। সামনেই পরীক্ষা। তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়ালেখা করি।’

তনুশ্রীর মতে, অনেকে মনে করেন, বিয়ে করা মানেই মেয়েদের পড়ালেখা-ক্যারিয়ার শেষ। কিন্তু তিনি তেমনটা মনে করেন না। ঘরসংসার সামলানোর পাশাপাশি ছেলেকে লালন–পালন করেই তিনি তাঁর পড়াশোনা শেষ করতে পারবেন বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান তনুশ্রী। তনুশ্রী বলেন, ‘ঘরসংসার, ছেলে—সবকিছু ঠিক রেখে আমি জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই।’ তনুশ্রী তাঁর কলেজের শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তবে যুক্তিবিদ্যার প্রভাষক সাবিহা বেগমের নামটা তিনি একটু বেশি করেই উল্লেখ করলেন। জানালেন, এই শিক্ষক তাঁকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করছেন। উৎসাহ দিচ্ছেন।

সাবিহা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘তনুশ্রীর পড়াশোনার প্রতি খুবই আগ্রহ। ছেলেকে নিয়ে পড়াশোনা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে চিন্তিত ছিল সে। ছেলেকে বাসায় কারও কাছে রেখে আসবে, সেই সুযোগও নেই। আমি তনুশ্রীকে আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা বলেছি। আমারও কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল। শ্বশুরবাড়ির বড় সংসারের সব দায়িত্ব পালন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছি। তনুশ্রীকে বলেছি, নিজে কিছু করতে চাইলে পড়াশোনা করতেই হবে। অন্যদের চেয়ে তাঁকে একটু বেশি পরিশ্রম করতে হবে, এই যা।’ (প্রথম আলো)

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!