যেসব খাবার খেলে কাজ করবে না অ্যান্টিবায়োটিকও, জরুরী তথ্য জেনে নিন

যেসব খাবার খেলে কাজ করবে না অ্যান্টিবায়োটিকও, জরুরী তথ্য জেনে নিন

অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ম করে পূর্ণ মেয়াদকাল অবধি খেলেও কাজে আসছে না ওষুধ! আজকাল প্রায়ই এমন অভিজ্ঞতার সাক্ষী রোগী থেকে চিকিৎসকরাও। এমনটা কি আপনার সঙ্গেও হয়েছে? তা হলে সাবধান! গবেষকদের দাবি, এই কাজ না করার কারণের নেপথ্যে দায়ী আরো এক অ্যান্টিবায়োটিক ‘কোলিস্টিন’।

না, তার মানে এই নয় যে, আপনিই ওষুধ আকারে এই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছেন, যার ফলে অন্য অ্যান্টিবায়োটিকের কাজ নষ্ট হচ্ছে। বরং এই ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের প্রবেশ শরীরে খানিক অন্যরকম ভাবে হয়। কীভাবে তা হয়। জানেন?

জ্বর বা সর্দি-কাশির সময় চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার চল নতুন নয়। প্রায়শই কড়া দাওয়াই দিয়ে অসুখ-বিসুখ ছাড়াতে অ্যান্টিবায়োটিকের শরণ নিতেই হয়। কিন্তু এই অ্যান্টিবায়োটিকের কর্মক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে পোলট্রির হাঁস-মুরগির ডিম ও মাংস খাওয়ার কারণে! শুধু পোলট্রিই নয়, মাংস প্রদান করে এমন পশুদের স্বাস্থ্যকর করে তোলার জন্যও এই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়, যা চরম ক্ষতি করে মানব স্বাস্থ্যের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সুবর্ণ গোস্বামীর মতে, ‘মানুষের শরীরে নানা রোগ প্রতিহত করতে যে অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ব্যবহৃত হয়, তাদের সবক’টি গুণাগুণই নষ্ট করে দিতে পারে এই কোলিস্টিন। এই অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহের বিশেষ কিছু সংক্রমণ

ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বা নির্দিষ্ট সমক্রমণের শিকার না হলেও এটি খেলে তার ক্ষতি মারাত্মক। অতিরিক্ত হৃদরোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়া, ওবেসিটি, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে লিভার ক্যানসারেরও কারণ এই কোলিস্টিন। বহুবার নানাভাবে ব্যবসায়িক স্বার্থে কোলিস্টিন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তবু সচেতনতা আসেনি, যা খুবই শঙ্কার বিষয়।’

চিকিৎসকদের পরামর্শ, মাংস-ডিম খাওয়ার আগে সচেতন হোন, চেষ্টা করুন ব্রয়লারের হাঁস-মুরগি এড়িয়ে আকারে ছোট, ওজনে হালকা হাঁস-মুরগি কিনতে। পশুর মাংসের সময়ও একইভাবে ছোট আকারের কম মাংসের পশু কিনুন। বাজারের প্রক্রিয়াজাত মাংস একেবারে না কেনাই ভালো। নইলে এই কোলিস্টিন ধীরে ধীরে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে নানা অসুখের দিকে ঠেলবে।

অসুখ সারাতে অ্যান্টিবায়োটিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে মুরগি ও গরুর ওপর অ্যান্টিবায়োটিকের এই নির্বিচারে প্রয়োগ মাংসজাতীয় খাদ্য ভোক্তার জন্য ‘বিষে’ পরিণত হচ্ছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। জেনে না-জেনে বিষাক্ত এ খাদ্যই টাকা দিয়ে কিনে নিজেদের বিপদ বাড়াচ্ছেন ক্রেতারা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, খাদ্যে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় এখন রোগীদের ক্ষেত্রে কম অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ কাজ করছে না। অ্যান্টিবায়োটিক মিশ্রিত মাছ কিংবা মাংস খেলে একসময় মানুষের শরীরে

ওষুধ হিসেবে আর অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর হবে না। তিনি বলেন, খাদ্যে ব্যবহৃত এ অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে লিভার, কিডনি, মস্তিষ্কসহ বিভিন্ন অঙ্গে বিরূপ প্রভাব দেখা দেয়। এটি বয়স্ক ও শিশুদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াও নানা কীটনাশক এখন ভোক্তার চরম ক্ষতি করছে। বাড়ছে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব। ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, এখন পশুপাখি ও মাছ উৎপাদনে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে তা দেখা যাচ্ছে। এর ব্যবহার কমানো জরুরি। এটা না হলে ভবিষ্যতে মানবদেহ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ জন্য সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

বিভিন্ন সংস্থা ও অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এখন চরমে পেঁৗছেছে। মাছ, মুরগি ও গরুর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হচ্ছে, বাজারে আসার আগে ফার্মের মুরগির শরীরে যত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি থাকে, এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি থাকে তা বাজারে আসার পর। মুরগি যাতে না মরে সে জন্য বিক্রির আগেও যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করছেন দোকানিরা। এ ছাড়া শাকসবজিতে অতিমাত্রায় কীটনাশকের উপস্থিতি মিলছে। নানা কেমিক্যাল ব্যবহার করে প্রসাধনী পণ্যেও ভেজাল দেওয়া হচ্ছে। নকল করে বাজারজাত করা হচ্ছে বড় বড় কোম্পানির ভোগ্যপণ্য, যা প্রতিনিয়ত ধরা পড়ছে বিএসটিআই ও র‌্যাবের যৌথ অভিযানে।

প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট পরিচালিত ২০১৪ সালের গবেষণায় দেখা যায়, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন নামের অ্যান্টিবায়োটিক খামারে পাওয়া গেছে ২৩ শতাংশ মুরগিতে। ওই একই অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে পাওয়া গেছে ৬৩ শতাংশ মুরগির শরীরে। সালফোনামাইড নামের অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে খামারে ৩০ শতাংশ আর বাজারের ৫৩ শতাংশ মুরগিতে। বর্তমানেও প্রায় একই অবস্থায় চলছে বলে জানান ওই ইনস্টিটিউটের এক কর্মকর্তা। ব্রয়লার মুরগির ১৪ শতাংশ মাংসে দ্বিগুণের বেশি আর্সেনিক পাওয়া গেছে। মুরগির খাদ্যে (পোল্ট্রি ফিড) ক্রোমিয়াম, লিড ছাড়াও ভারী ধাতবের উপস্থিতি রয়েছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর মিরপুর-২ কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা গেল, মুরগির খাওয়ার পানির সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে রেখেছেন দোকানিরা। ওই পানি খাওয়া মুরগি সরাসরি বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতা আবু জাফর বলেন, একটি মুরগি মারা গেলে তিনশ’ টাকা লোকসান দিতে হবে। এ কারণে দোকানিরা মুরগিকে নিয়মিত ওষুধ দিচ্ছেন।

মৎস্য অধিদপ্তরের পর্যালোচনায় ২০১১ সালে ১৫ শতাংশ মাছের খাদ্য নমুনায় ক্ষতিকর, এমনকি নিষিদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ২০১২ সালে তা কমলেও পরের বছরে তা আবারও বেড়ে গিয়ে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি ১৬ শতাংশ ছিল। মানবস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কারণে দেশে গরুর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুসারে খামারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়েছে এমন গরুর সংখ্যা ১৪ শতাংশ। সবজিতেও অতিমাত্রায় কীটনাশকের ব্যবহার হচ্ছে। ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির (এনএফএসএল) গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরের গবেষণা অনুযায়ী বেগুন, লালশাক ও শিমের নমুনা পরীক্ষায় ক্ষতিকর মাত্রায় কীটনাশক ছিল। ল্যাবরেটরির প্রধান গবেষক শাহনিলা ফেরদৌসী বলেন, তাদের গবেষণাগারে সবজি পরীক্ষা করে আট ধরনের কীটনাশকের উপস্থিতি পেয়েছেন। কিছু কিছু কীটনাশক অতিমাত্রায় ব্যবহার হয়েছে। তিনি বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বাড়ায়।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল হোসেন মিঞা বলেন, প্যাকেটজাত পণ্যে ভেজাল, বাড়তি দামে বিক্রি ও ওজনে কম দেওয়ার প্রমাণ মিললে জরিমানা ও শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ের প্রমাণ থাকলে ক্রেতাদের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করার আহ্বান জানান তিনি। মহাপরিচালক বলেন, খোলা খাদ্যপণ্যের বিষয়ে আইনে আগে সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকায় ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। এখন আইনের সংশোধন হচ্ছে। এতে খাদ্যপণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় দেখভালের অভাবে পশুখাদ্যে ঝুঁকিপূর্ণভাবে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হচ্ছে। বিশেষত গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ প্রায় সব ভেটেনারি ফার্মের খাদ্যে মেশানো হচ্ছে এসব অ্যান্টিবায়োটিক। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা ‘সুপার বাগ’ বা ‘শক্তিশালী জীবাণু’ নামে পরিচিত।

জানা গেছে, যখন হাঁসমুরগি ও পশুকে যখন অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক মিশ্রিত খাদ্য খাওয়ানো হয় তখন তাদের মাংস, দুধ কিংবা ডিমে এসবের প্রভাব রয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এদের শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠে। যখন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, তখন তারা মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে এবং চিকিৎসকের দেয়া অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধও ওই রোগ সারাতে ব্যর্থ হয়।

বিশেজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে গরুছাগল, হাঁসমুরগিসহ প্রায় অধিকাংশ ফার্মের পশু থেকে উৎপাদিত খাবারেও অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা খাদ্য হিসেবে মানবস্বাস্থ্যের জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

উল্লেখ্য, অ্যান্টিবায়োটিক হল ওই সকল ঔষধ যেটা সাধারণত ব্যাকটেরিয়াঘটিত সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে অথবা তাদের বংশবৃদ্ধি বন্ধ করে।

১৯৪০ সাল হতে, বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক গবাদি পশুপাখির খামারে সংক্রমণ চিকিৎসায় অথবা রোগ বিস্তার প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়ে আসছে যা ‘থেরাপিউটিক ইউজ’ নামে পরিচিত। কোন ফার্মের শেডে যদি একটিও সংক্রমিত গবাদি পশুপাখি পাওয়া যায় তাহলে তা অন্য পশুপাখিতে যাতে না ছড়ায় এজন্যে তা ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে এর আরেকটি ব্যবহার হল ‘সাব-থেরাপিউটিক ইউজ’। এটি পশুপাখির স্বাস্থ্য উন্নত করতে তাদের খাদ্যে মেশানো হয়, যার প্রধান উদ্দেশ্য হল কম সময়ের মধ্যে বেশি মাংস অথবা দুধ উৎপাদন করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া। এটি খামারের গবাদি পশুপাখির মৃত্যুর হার কমাতে এবং উন্নত বংশ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এই কারণে পশুর খাবারে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।

ইউরোপে গবাদি পশুপাখির খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো ২০০৬ সাল থেকে নিষিদ্ধ। অ্যান্টিবায়োটিকসহ কোন ক্ষতিকর উপকরণ যাতে খাদ্য সরবরাহে প্রবেশ করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কঠোর আইন বহাল করা হয়েছে। একই আইন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে বহাল করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত পশুর মাংস থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যদি কোন অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া আছে এমন পশুর মাংস সঠিকভাবে রান্না না করা হয়, তবে তা খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। জমিতে সার হিসেবে ব্যবহৃত পশুর বর্জ্য যদি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বহন করে, তাহলেও তা ছড়াতে পারে। একবার মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে, এরা মানুষের অন্ত্রনালীতে সুপ্তাবস্থায় থেকে যেতে পারে এবং পরবর্তীতে তা অন্যদের মধ্যেও ছড়াতে পারে।

মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, কীটনাশক, ইত্যাদি ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ‘মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ২ নং আইন)’ এর ১৪ এর (১) ও (২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড ও কীটনাশকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা যাইবে না।’

কাজ করছে না অ্যান্টিবায়োটিক কলিস্টিন

জটিল রোগের শেষ ভরসা অ্যান্টিবায়োটিক কলিস্টিনও কাজ করছে না। যথেচ্ছ ব্যবহারে অনেক রোগ নিয়ন্ত্রণে শেষ ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো যে কলিস্টিন তা এখন অকার্যকর হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন চিকিৎসকেরাও। এ জন্য দায়ী করা হচ্ছে পোলট্রি শিল্পকে। পোলট্রি শিল্পে মুরগির রোগ সারাতে অতি মাত্রায় ব্যবহারে মানুষের জন্য উপকারী এ অ্যান্টিবায়োটিকটি আজকে অকার্যকর বলে দাবি করেছেন আইসিডিডিআর.বির বিজ্ঞানীরা। পরীক্ষাগারে কলিস্টিন ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী ই-কোলিকে ১১টি ভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক পরীক্ষায় মাল্ট্রি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স (এমডিআর) হিসেবে পাওয়া গেছে।

আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘গাট প্যাথোজেনে’ এ সংক্রান্ত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। এ গবেষণার সিনিয়র অথর ও আইসিডিডিআর.বির সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. মনিরুল আলম বলেন, ‘কলিস্টিন ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী হয়ে পড়ায় এটা মানুষের মধ্যে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটেছে। কারণ একটা সময় কার্বোপেনেম (একসময়ের অত্যন্ত কার্যকর একটি অ্যান্টিবায়োটিক। এ অ্যান্টিবায়োটিককে বলা হতো ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণের বিরুদ্ধে শেষ আশ্রয়) ব্যবহার করেও যে রোগ সারানো যায়নি তা কলিস্টিন দিয়ে সারানো যেত।’ ড. মনিরুল আলম বলেন, ই-কোলি বিচিত্র ধরনের একটি ব্যাকটেরিয়া, যা খাদ্যে, মানুষ ও প্রাণীর ইনটেস্টাইনে (পাকস্থলীর শেষ দিকের অংশ) থাকে এবং মারাত্মক ডায়রিয়ার কারণ হয়ে থাকে। এ গবেষণা আইসিডিডিআর.বি, যুক্তরাষ্ট্রের এনআইএইচ, জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফেকশাস ডিজিজেস (এনআইআইডি) সমর্থনে করা হয়েছে। ড. মনিরুল আলম বলেন, কলিস্টিন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে যাওয়া মানে হলো- কেউ এমডিআর ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে তাকে আর সারিয়ে তোলা যাবে না। ফলে অনেক রোগীকে না-ও বাঁচানো যেতে পারে।’

গবেষণায় বলা হয়েছে, পোলট্রি ফার্মে নানা ধরনের রোগ সারাতে কলিস্টিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিকের অতি ব্যবহারের কারণে তা এখন আর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করছে না। আবার প্রাণীর দেহে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক গোশতের মাধ্যমে মানুষের দেহে চলে আসছে। মানুষের দেহে তা পরিমাণে কম হওয়ায় মানুষের দেহে বসবাসকৃত ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের মধ্যে কলিস্টিনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছে। আবার পোলট্রি শিল্পের বিষ্ঠা থেকে কলিস্টিন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবেশের মধ্যে থাকা অন্য ব্যকটেরিয়াগুলোও প্রতিরোধী হয়ে যাচ্ছে। আইসিডিডিআর.বির সমীক্ষা অনুসারে বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ পোলট্রি শিল্পে কলিস্টিন ব্যবহার হচ্ছে। পোলট্রি শিল্পে অতিরিক্ত ব্যবহারে ই-কোলি ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স হয়ে যাচ্ছে।

ড. মনিরুল আলম বলেন, বাংলাদেশে মনুষ্য বর্জ্য শোধন না করেই পানিতে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য পানিতে মিশে মানুষের খাদ্য চক্রে ঢুকে যাচ্ছে। বর্জ্য খেয়ে মাছ বড় হচ্ছে। মাছ আবার মানুষে খাচ্ছে। এভাবে খাদ্য চক্রে প্রবেশ করে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহারের প্রতি মনোযোগ দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। তা না হলে শুধু কলিস্টিন নয়, আরো অনেক প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে উঠবে। রোগে-শোকে মানুষ আর ওষুধ খুঁজে পাবে না।

ভবিষ্যতে অপারেশনও করা যাবে না!

অ্যান্টিবায়োটিক বিরোধী জীবাণু সামাল দেয়ার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গৎ বাধা সাধারণ অপারেশনও কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠবে। নতুন এক সমীক্ষায় এ ভয়াবহ হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।

১৯৬৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ৩১টি সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে নতুন এ সমীক্ষা চালানো হয়েছে। আর এটি চালিয়েছে ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর ডিজিজি ডাইনামিক্স, ইকনমিক্স এবং পলিসি।

ব্যাপক এবং যথেচ্ছ ব্যবহারের পরিণামে প্রাণরক্ষায় জড়িত ওষুধ ধীরে ধীরে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এ সমীক্ষায় জড়িত গবেষকরা এমন সর্বনাশা প্রমাণ দেখতে পেয়েছেন।

তারা দেখেছেন, ক্যান্সার আক্রান্ত মহিলাদের সিজারিয়ান অপারেশনের পর তাদের শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে আর এ সব সারিয়ে তোলা যাচ্ছে না।

৪৩ বছরের সমীক্ষার ভিত্তিতে গবেষকরা আরো দেখতে পেয়েছেন, অপারেশনের সময় সংক্রমণের শিকার হয়েছেন অনেক রোগীই; তাদের অর্ধেককেই প্রমিত বা স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সারিয়ে তোলা যাচ্ছে না।

সিজারিয়ান অপারেশন সময় যে সব নারী সংক্রমণের শিকার হয়েছেন তাদের ৩৯ শতাংশই একই অবস্থায় পড়েছেন। এ ছাড়া, কেমোথেরাপির রোগীদের মধ্যে একই অবস্থায় পড়েছেন ২৭শতাংশ রোগী।

এ সমীক্ষায় জড়িত গবেষকরা দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। না হলে অপারেশন এবং কেমোথেরাপি চালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তারা।

ভবিষ্যতে সংক্রমণের হার কতোটা বাড়তে পারে তারও একটি হিসাব দিয়েছেন গবেষকরা। এ হিসাবে দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা এক তৃতীয়াংশের কম হ্রাস পেলে প্রতি বছর আমেরিকায় আরো এক লাখ ২০ হাজার রোগী সংক্রমণের শিকার হবেন। এদের মধ্যে মারা যাবেন ১,২৬০ রোগী।

মানুষের এমন স্বাস্থ্য সংকট সৃষ্টির পেছনের কারণও তুলে ধরেছেন গবেষকরা। তারা বলেছেন, গত প্রায় ৫০ বছর ধরে অতিমাত্রায় প্রয়োগ করা হয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক। এতে অ্যান্টিবায়োটিক ঠেকানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে ব্যাকটেরিয়া।

এ ছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পশু-খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দেয় কৃষকেরা। আর এতেও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরির পথ সুগম হয়।

Share this:

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!